
লন্ডন/উইগান: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে গেল। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ফিরেছেন, যা তাকে ভবিষ্যতে লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্যভাবে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
শুক্রবার ভোরে ঘোষিত ফলাফলে বার্নহ্যাম ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, ডানপন্থী জনতাবাদী দল রিফর্ম ইউকের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়ন পান ৩৫ শতাংশ ভোট। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই ওয়েস্টমিনস্টারে জল্পনা শুরু হয়েছে—লেবার পার্টির ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপটে বার্নহ্যাম কি স্টারমারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন?
নির্বাচন-পরবর্তী বক্তব্যে বার্নহ্যাম বলেন, “দেশের মানুষ অনুভব করছে যে রাজনীতি ঠিকভাবে কাজ করছে না। আজকের রাত হয়তো সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে ঐক্য ও আশার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সময় এসেছে।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে লেবার পার্টি। তবে সরকার গঠনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে শুরু করে। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় ধরনের ক্ষতি এবং রিফর্ম ইউকের উত্থান লেবারের অভ্যন্তরে অসন্তোষকে আরও উসকে দেয়।
অনেক লেবার এমপি স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করলেও এতদিন কার্যকর বিকল্প নেতৃত্বের অভাব ছিল। ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, কেবল একজন বর্তমান এমপিই দলীয় নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ফলে সংসদের বাইরে থাকা বার্নহ্যাম এতদিন নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নিতে পারেননি।
মেকারফিল্ডের সাবেক এমপি জশ সাইমন্স মে মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, যাতে বার্নহ্যাম সংসদে ফিরে আসার সুযোগ পান। পরে লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি তাকে প্রার্থী হওয়ার অনুমোদন দেয়।
ফলে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের সাবেক কয়লাখনি অধ্যুষিত এই আসনটি কয়েক সপ্তাহের জন্য জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশের সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর ছিল প্রায় ৭৫ হাজার ভোটারের সিদ্ধান্তের ওপর, যা যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রচারণার সময় বার্নহ্যামকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রবার্ট কেনিয়ন স্থানীয় অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন ইস্যুকে সামনে এনে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি বারবার অভিযোগ করেন যে বার্নহ্যাম মেকারফিল্ডকে কেবল নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ‘স্টেপিং স্টোন’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে বিজয়ী বক্তব্যে বার্নহ্যাম সেই সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, “মেকারফিল্ড আমার কাছে কখনও রাজনৈতিক সিঁড়ি নয়, বরং একটি মূল্যবোধের কেন্দ্রবিন্দু হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের সাফল্য তাকে লেবার পার্টির সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দীর্ঘদিনের মেয়র হিসেবে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনসংযোগের অভিজ্ঞতা তাকে স্টারমারের তুলনায় বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে অনেক ভোটারের কাছে।
যদিও তিনি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের জন্য প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেননি, তবে সংসদে তার প্রত্যাবর্তন ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেছে। আগামী মাসগুলোতে লেবার সরকারের জনপ্রিয়তা যদি আরও কমে, তাহলে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।