এক শতাব্দীরও বেশি আগে শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া একটি প্রতিবাদ আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিবসে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস এখন বিশ্বের শতাধিক দেশে পালন করা হয়। এই দিনে নারীদের অর্জন উদযাপনের পাশাপাশি সমতা, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিও তুলে ধরা হয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন শিল্পায়নের ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে এবং তারা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন।
১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রায় ১৫ হাজার নারী মিছিল করেন, যেখানে তারা কম কর্মঘণ্টা, ভালো বেতন এবং ভোটাধিকার দাবি করেন। এর পরের বছর ১৯০৯ সালে, আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দল যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম জাতীয় নারী দিবস পালন করে।
এই আন্দোলন দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ পায়। ১৯১০ সালে, জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
এরপর ১৯১১ সালে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়, যেখানে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯১৭ সালে, যখন রাশিয়ার নারীরা “রুটি ও শান্তি” দাবিতে আন্দোলনে নামেন। এই আন্দোলন পরবর্তীতে রুশ বিপ্লবের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই প্রতিবাদ হয়েছিল ৮ মার্চ, এবং পরবর্তীতে এই তারিখই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে নির্ধারিত হয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বব্যাপী আরও গুরুত্ব পায় যখন জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন করে। ওই বছরটি ছিল আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ।
এরপর ১৯৭৭ সালে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ৮ মার্চকে নারীর অধিকার ও বিশ্বশান্তির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়। তখন থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বজুড়ে বিভিন্নভাবে উদযাপন করা হয়।
ইউরোপের অনেক দেশে, বিশেষ করে ইতালিতে, নারীদের মিমোসা ফুল উপহার দেওয়া একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্য। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে এই দিনটি উৎসবের মতো উদযাপিত হয় এবং নারীদের উপহার ও শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এশিয়ার কিছু দেশে, যেমন চীন ও ভিয়েতনামে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সম্মান জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং কোথাও কোথাও নারীদের জন্য বিশেষ ছুটির ব্যবস্থাও থাকে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সমান মজুরি, নারীর নিরাপত্তা এবং সমান অধিকারের দাবিতে মিছিল, আলোচনা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ একটি বৈশ্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপলক্ষে পরিণত হয়েছে। সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন এই দিনে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক সমতার বিষয়ে নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করে।
তবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও নারীদের জন্য সমান মজুরি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার সংগ্রাম এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ এমন একটি বৈশ্বিক মুহূর্ত, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নারীদের অর্জন উদযাপন করার পাশাপাশি লিঙ্গসমতার পথে এখনও বাকি থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে এবং সেগুলো দূর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।