বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সম্পর্ক অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণহত্যা ও পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার সত্যকে স্বীকার করার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দুর্বল করার পাশাপাশি পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, আইনের শাসন ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর আঘাত।
তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নয়নমুখী ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে গেলেও বর্তমানে ভয়, সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উগ্রবাদের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবের জন্য তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে দায়ী করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপসহ সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতা কখনো উপেক্ষা করা উচিত নয়।
ভারতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত সরকার তাঁকে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিয়েছে এবং ১৯৭১ সালের মতো কঠিন সময়েও ভারত বাংলাদেশের পাশে ছিল বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা দাবি করেন, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষে কথা বললেই হয়রানি ও দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফিরতে চান। তাঁর দাবি, জনগণ তাঁকে ফিরে আসতে চায় এবং দেশের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে চান।
২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। তাঁর অভিযোগ, দেশীয় রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রচারণা, অর্থায়ন, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং বিভিন্ন মহলের সমন্বয়ে এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সংযোগ এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। তাঁর মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ বৃদ্ধি পেলে এবং ভারতবিরোধী রাজনীতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দুই দেশের অর্জিত অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সংকট দলকে দুর্বল করেনি; বরং আদর্শিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।