১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান এমন এক বাংলাদেশে পা রেখেছেন, যেখানে রাজনীতি বদলেছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। TIME ম্যাগাজিনকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার শরীর এখনো এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে… আমি খুব ভালো বক্তা নই, কিন্তু দায়িত্ব পেলে চেষ্টা করি।”
২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে বিমানবন্দরে জড়ো হয় লাখো সমর্থক। পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। শোকের মধ্যেই তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়ের পথে—সাম্প্রতিক জরিপে দলটির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ।
তারেক রহমান নিজেকে উপস্থাপন করছেন একজন নীরব, পরিকল্পনাভিত্তিক সংস্কারক হিসেবে। তিনি TIME-কে বলেন, বাংলাদেশে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো, ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ অঞ্চল, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা আছে। “আমি যদি ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” বলেন তিনি।
কিন্তু তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তার অতীত। ‘খাম্বা তারেক’ থেকে শুরু করে দুর্নীতির বহু অভিযোগ এখনো তার ভাবমূর্তির পিছু ছাড়েনি। ২০০৮ সালের একটি মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় তাকে “দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির প্রতীক” বলা হয়েছিল। তার জবাব, “ওরা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।” অন্তর্বর্তী সরকার তার বিরুদ্ধে আগের সাজাগুলো বাতিল করেছে।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বড় হলেও রাজনীতি হয়ে ওঠে দমনমূলক। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, এই সময়ে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ গুম হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান এবং হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি। এখন তিনি ভারত থেকে বলছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা গণতান্ত্রিক হবে না।
TIME-কে তারেক রহমান বলেন, তিনি নীতিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নন। “আজ কাউকে নিষিদ্ধ করলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করবে না—তার নিশ্চয়তা কোথায়?” তবে তিনি জোর দেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হতেই হবে।
রাজনৈতিক শূন্যতায় নতুন করে শক্তিশালী হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, যারা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে বড় সাফল্য পেয়েছে। এতে নারী, সংখ্যালঘু ও উদারপন্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতিও বড় সমস্যা। তারেক রহমান বলেন, তার প্রথম অগ্রাধিকার হবে “রাস্তায় মানুষকে নিরাপদ করা”।
ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের টানাপোড়েনের কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি বাংলাদেশের ওপর ২০% শুল্ক আরোপ করেছে। তারেক রহমান TIME-কে জানান, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং বিমান ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো সমঝোতার কথা ভাবছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে তিনি বলেন, “তিনি নিজের দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমিও আমার দেশের। কিন্তু আমরা একে অন্যকে সাহায্য করতে পারি।”
ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমান নিজেকে তুলে ধরেছেন এক নিঃসঙ্গ, অন্তর্মুখী মানুষ হিসেবে। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে ও ইতিহাসের বই পড়ে। প্রিয় সিনেমা Air Force One। এখন ঢাকায় কাঁটাতারের ঘেরা বাড়িতে তাঁর স্বাধীনতা সীমিত। “আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি আমার স্বাধীনতাকে,” তিনি বলেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—১৭ বছরের নির্বাসন কি তারেক রহমানকে বদলেছে? নাকি বাংলাদেশ আবারও ফিরবে পুরনো রাজনীতির চক্রে? TIME-কে তিনি বলেন, “যাদের জীবন গেছে, তাদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব আছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”
বাংলাদেশের সামনে এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ—এই পরিবর্তন কি সত্যিকারের সংস্কার আনবে, নাকি কেবল ক্ষমতার হাতবদল হবে?