প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সফরের শেষে ২৬ জুন দুই দেশ একটি যৌথ কমিউনিক জারি করতে যাচ্ছে, যা ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরকালে ১৫টিরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও প্রোটোকল সইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে যৌথ কমিউনিক জারির সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতাও থাকবে।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে সোমবার রাতে চীনে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ তিন নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত এই উদ্যোগে যোগদানের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি এমওইউ সইয়ের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় এক দশক পর চীনের আরেকটি বৈশ্বিক উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়েছিল।
বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যেও একটি পৃথক সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি রয়েছে, যা রাজনৈতিক দল-ভিত্তিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
সফরের অর্থনৈতিক অংশেও রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এজেন্ডা। মংলা বন্দর আধুনিকায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং চীনা ভাষা শিক্ষাবিষয়ক তিনটি চুক্তির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কারিগরি শিক্ষা এবং গণমাধ্যম সহযোগিতা নিয়ে একাধিক এমওইউ সই হবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগও এই সফরের অংশ।
২৩ ও ২৪ জুন দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’-এ অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলোচনায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি বৈশ্বিক ব্যবসা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পরে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নিয়ে চীনের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামানের মতে, সফরটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহে চীনের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। ঢাকার লক্ষ্য থাকবে—কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও নীতিগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।
পাঁচ দশকের সম্পর্কের নতুন এই অধ্যায়ে বাংলাদেশ ও চীন অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত সহযোগিতার এক বিস্তৃত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।