বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে সফরের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, ঢাকা বলছে—দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি “অনুকূল পরিবেশ” তৈরি না হলে উচ্চপর্যায়ের এই সফর এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রথম ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অনুরোধ দেশটির আইনি কাঠামো অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারতীয় পক্ষ থেকে ২২ থেকে ২৪ আগস্টের মতো একটি সংকীর্ণ সময়সীমা নিয়ে আলোচনা চলছে—এমন দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এলেও এই নির্দিষ্ট তিন দিনের সময়সীমা ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখনো সম্ভাব্য সফরের তারিখ নিয়ে আলোচনা করছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
১০ আগস্ট ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এর আগে এবং পরেও শেখ হাসিনাকে ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
ঢাকার অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ভারতে অবস্থান নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। দিল্লি বিষয়টি তার আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে।
ফলে সম্ভাব্য দিল্লি সফরটি নিছক সৌজন্য সফরের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি একই সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকট, সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরীক্ষাও হতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা নিয়মিত নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এমন অনিশ্চয়তা প্রশ্ন তুলছে—দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর মধ্যে রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি কেন এতটা গভীর?
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সমস্যাটি বাংলাদেশের গুরুত্ব কমে যাওয়ার চেয়ে বরং দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষে নিহিত। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, প্রত্যর্পণ দাবি এবং ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পর্শকাতর।
ভারতের পক্ষেও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করা সহজ নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে এবং নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী ফলের পর তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে তাকে অভিনন্দন জানান।
এপ্রিল মাসে ভারত নতুন হাইকমিশনার হিসেবে অভিজ্ঞ রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নিয়োগ দেয়—যাকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশও ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় দুই পক্ষই সফরটি আয়োজন করতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত মিলছে। তবে তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
সফরটি শেষ পর্যন্ত হলে মোদি ও তারেকের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পথে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আর যদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শর্তের কারণে সফর পিছিয়ে যায়, তাহলে সেটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের আস্থার সংকট এখনো কতটা গভীর—তারই আরেকটি বার্তা হিসেবে দেখা হবে।