নির্বাসন থেকে বিরল ও বিস্তৃত এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে তিনি “সংবিধানগতভাবে অবৈধ” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
CNN-News18–কে দেওয়া কথোপকথনে শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর পরিবার ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া একাধিক আইনি পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)–এর চলমান কার্যক্রমকে তিনি “বিজয়ীর বিচার” বলে বর্ণনা করে সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন।
হাসিনার ভাষায়, সংসদীয় তদারকি ছাড়া পাস হওয়া সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো অবৈধ এবং এর পরিণতি একদিন জাতিকে “ভুগতেই হবে”। তাঁর মতে, জাতীয় পুনর্মিলনের একমাত্র পথ হলো দ্রুত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং প্রকৃত, নিরপেক্ষ আইনের শাসন।
নির্বাসনে থেকেও তিনি দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান। “আমার সবচেয়ে বড় কামনা শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং প্রতিটি বাংলাদেশির নিরাপত্তা,” বলেন তিনি। রাজনৈতিক বঞ্চনা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর অর্থনৈতিক ব্যাঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র আন্দোলন থেকে উদ্ভূত সহিংসতার প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, শুরুতে যৌক্তিক দাবিভিত্তিক আন্দোলনকে “দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক শক্তি” উসকে দেয়। তাঁর দাবি, ওই সময়কার ঘটনাবলির নিরপেক্ষ ও সৎ মূল্যায়ন না হলে ইতিহাস কঠোর রায় দেবে।
আইসিটি কর্তৃক অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায়কে তিনি “তড়িঘড়ি ও পক্ষপাতদুষ্ট” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল না, প্রমাণ যাচাই হয়নি এবং ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার পরিবর্তন সংসদ এড়িয়ে নির্বাহী আদেশে করা হয়েছে—যা সংবিধানবিরোধী।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের আহ্বান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনের শাসনের বাইরে কোনো রাজনৈতিক অনুরোধ গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, “ন্যায়বিচার বিভাজন নয়, আরোগ্য আনে।”
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভূমি বরাদ্দ মামলায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের দণ্ডাদেশকেও তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে আখ্যা দেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
১৫ বছরের শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও অবকাঠামো উন্নয়নকে নিজের সরকারের স্থায়ী অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তবে আসন্ন ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে উল্লেখ করেন। “দশ কোটি ভোটারকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না,” বলেন তিনি।
হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবরকে “ভয়াবহ” আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে তিনি ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, নির্বাচন বিলম্বিত ও বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার অবস্থান স্পষ্ট: “আইনের শাসন, সংবিধানিক শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে আমার ফেরার প্রশ্নই আসে না।”