যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে একটি নতুন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউস থেকে সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এই চুক্তির ফলে উভয় দেশের রপ্তানিকারকরা একে অপরের বাজারে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত প্রবেশাধিকার পাবে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই সমঝোতা ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট (TICFA)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। উভয় দেশ নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে চুক্তিটি কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দেবে। এতে রাসায়নিক পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও মোটরযান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সামগ্রী, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরু ও মুরগির মাংস, বাদাম ও ফলমূল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কহার কমিয়ে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কহার শূন্য শতাংশ করা হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে বাংলাদেশ একটি নির্ধারিত কোটা সুবিধা পাবে, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে না। এই কোটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম ফাইবারের পরিমাণের সঙ্গে সমন্বিত থাকবে।
চুক্তিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান নন-ট্যারিফ বাধা কমাতে বাংলাদেশের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুসারে তৈরি যানবাহন গ্রহণ, মার্কিন এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধের স্বীকৃতি এবং পুনর্নির্মিত (remanufactured) পণ্যের ওপর আমদানি সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ডেটার অবাধ সীমান্ত পারাপার নিশ্চিত করা, ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর শুল্ক আরোপ না করার বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) স্থায়ী সমর্থন, কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং উত্তম নিয়ন্ত্রক চর্চা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার সুরক্ষা, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধকরণ এবং শ্রম আইন সংশোধন ও প্রয়োগ জোরদারের অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, ভর্তুকি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে সৃষ্ট বাজার বিকৃতি কমানো এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য—গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা—আমদানির পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উড়োজাহাজ ক্রয় এবং কৃষি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তির সম্ভাবনাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন এই চুক্তিকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।