ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সব ধরনের ‘ষড়যন্ত্র ও বাধা’ অতিক্রম করে তিনি চলতি বছরই বাংলাদেশে ফিরবেন। তাঁর ভাষায়, দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; বরং গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে এটি জড়িত।
এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতেও তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে, তবে সেসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দলটি ‘কাগুজে সংগঠন নয়’; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান কোনো সরকারের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না, বরং জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই দলটি আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নিরাপত্তার অবনতি ঘটেছে। তাঁর মতে, অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, চরমপন্থার বিস্তার ঘটেছে এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ব্যাপক রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও হাজারো মামলার মধ্যেও রাজনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিকভাবে দমন করা গেলেও জনগণের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায় না। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গেছে। তাঁর অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে, যা রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রকে দুর্বল করেছে।
নিজের সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। তাঁর দাবি, বর্তমানে সেই উন্নয়নের ধারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো গোপন আলোচনা চলছে—এমন গুঞ্জনও নাকচ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার বা ন্যায়বিচার কোনো গোপন সমঝোতার বিষয় নয়; এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিকের ভয় নিয়ে বসবাস করা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক।
ভারতে অবস্থান নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর মন সবসময় বাংলাদেশেই রয়েছে। তিনি জানান, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও দেশের মানুষ, দলীয় নেতাকর্মী এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনই তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, জনগণের শক্তির ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে এবং সেই শক্তির মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, সব বাধা অতিক্রম করে চলতি বছরের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন।