ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X–কে একটি পূর্ণাঙ্গ “এভরিথিং অ্যাপ”-এ রূপান্তর করার পরিকল্পনা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। কোম্পানিটি শিগগিরই চালু করতে যাচ্ছে X Money, একটি ডিজিটাল ওয়ালেট ও পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন সরাসরি প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই সম্পন্ন করার সুযোগ দেবে।
এই উদ্যোগটি মাস্কের দীর্ঘদিনের ঘোষিত লক্ষ্য—একটি এমন অ্যাপ তৈরি করা যেখানে সামাজিক যোগাযোগ, পেমেন্ট এবং বিভিন্ন আর্থিক সেবা একই জায়গায় পাওয়া যাবে—তার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি সফল হলে X পশ্চিমা বিশ্বের জন্য চীনের সুপার-অ্যাপ মডেলের একটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, X Money ইতোমধ্যে কোম্পানির অভ্যন্তরে ক্লোজড বিটা পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং শিগগিরই সীমিত পরিসরে বাহ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য পরীক্ষামূলক সংস্করণ চালু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়ালেটে অর্থ যোগ করতে পারবেন, পিয়ার-টু-পিয়ার অর্থ পাঠাতে পারবেন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করতে পারবেন। ভবিষ্যতে একটি ডেবিট কার্ড যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই পরিষেবা চালুর আগে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনও সংগ্রহ করছে X। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে মানি ট্রান্সমিটার লাইসেন্স অর্জন করেছে। পাশাপাশি এর পেমেন্ট ইউনিট X Payments যুক্তরাষ্ট্রের ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (FinCEN)–এ নিবন্ধিত। কোম্পানি Visa-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বও নিশ্চিত করেছে, যা ব্যবহারকারীদের ওয়ালেটে দ্রুত অর্থ যোগ করার সুবিধা দিতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে X Money একটি সহজ ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে কাজ করবে—যেখানে ব্যবহারকারীরা সরাসরি মেসেজ পাঠানোর মতো সহজেই অর্থ পাঠাতে পারবেন। তবে মাস্কের পরিকল্পনা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়।
তার পূর্ববর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্মে উচ্চ সুদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট, বিনিয়োগ সেবা, ঋণ সুবিধা, মানি মার্কেট ফান্ড এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো আর্থিক পণ্য যুক্ত হতে পারে। এছাড়া ক্রিপ্টোকারেন্সি ইন্টিগ্রেশন এবং রিয়েল-টাইম শেয়ারবাজার তথ্য দেখার সুবিধাও যুক্ত হতে পারে।
এই পরিকল্পনার অনুপ্রেরণা এসেছে চীনের জনপ্রিয় সুপার-অ্যাপ WeChat থেকে। টেনসেন্টের মালিকানাধীন এই অ্যাপটি মেসেজিং, পেমেন্ট, অনলাইন শপিং এবং আর্থিক সেবা একত্রে প্রদান করে এবং প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করে।
মাস্ক বহুবার বলেছেন, X-কে একই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করাই তার লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ব্যবহারকারীদের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি বৈশ্বিক আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চান।
এই মডেলে ব্যবহারকারীর X প্রোফাইলই হতে পারে তার ডিজিটাল আর্থিক পরিচয়। একই অ্যাপের মাধ্যমে ক্রিয়েটরদের পেমেন্ট, সাবস্ক্রিপশন ফি, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিনিয়োগ—সবকিছু পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি X-এর জন্য একটি বড় পরিবর্তন। বিজ্ঞাপন আয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফিনটেক পরিষেবা থেকে লেনদেন ফি, ওয়ালেট ব্যালেন্সের সুদ, ঋণ এবং বিনিয়োগ পরিষেবা থেকেও রাজস্ব আসতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারের পরিমাণ বর্তমানে দশ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই বাজারের সামান্য অংশ দখল করতে পারলেও X-এর ব্যবসায়িক মূল্যায়ন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।
২০২২ সালে ইলন মাস্ক যখন প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারে Twitter অধিগ্রহণ করেন, তখন অনেকেই সেই মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে সমর্থকদের মতে, যদি X সত্যিই একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়, তাহলে সেটি একটি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই—মাস্ক কি সত্যিই তার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে পারবেন? যদি পারেন, তবে X হয়তো ভবিষ্যতে কেবল একটি সোশ্যাল মিডিয়া নয়, বরং বৈশ্বিক ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।